শিবির কার্যালয় থেকে ছয়টি ককটেল ও ককটেল তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে জোট, ভোট ও সংলাপ- কোনোটিতে নেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গত ছয় মাসে দেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা জামায়াতকে কেউ আর প্রকাশ্যে সঙ্গে রাখতে চাইছে না। তাই বলে থেমে নেই দলটির কর্মকাণ্ড।

পুলিশ বলছে, “ক্যাডারভিত্তিক দলটি এবং এর ছাত্র সংগঠন শিবির চুপচাপ বসে নেই। আগামী নির্বাচন নিয়ে রীতিমতো ‘রণপ্রস্তুতি’ নিয়ে রেখেছে জামায়াত-শিবির।”

সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ১ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল ও অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পাওয়ার পর গত ২৮ অক্টোবর জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নিজের নামে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এত গেল নামের বিষয়। অবস্থাদৃষ্টে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, নব্বইয়ের দশকের পর এই প্রথম কোনো নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী কোনোভাবেই আলোচনার অংশ নয়। ২০ দলীয় জোটের অংশ হিসেবে ভেতরে ভেতরে বিএনপির সঙ্গে লিয়াজোঁ থাকলেও সেই জোটকে ছাপিয়ে এখন আলোচনায় ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

নতুন এই জোটে জামায়াতের কোনো স্থান নেই বলে প্রকাশ্যে জানিয়েছেন ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল ও জোটের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

সরকারি দলের পক্ষ থেকেও জামায়াতের সঙ্গে কোনো আলোচনা নেই বলে সরাসরি জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় পুরোপুরি একঘরে জামায়াত আগামী নির্বাচন সামনে রেখে দুটি লক্ষ্যে নিজেদের প্রস্তুতি করছে বলে জানিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেফতার জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের স্বীকারোক্তি এবং উদ্ধার হওয়া নথিপত্র থেকে জানা গেছে, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পৃক্ত না থাকলেও নতুন এ জোটের নির্বাচনে যাওয়া, না যাওয়ার ওপর নির্ভর করছে জামায়াত-শিবিরের কর্মপরিকল্পনা। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যদি ভোটে অংশ নেয়, তবে ২০ দলীয় জোটের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের তিনটিসহ সারাদেশে ৫০টির বেশি আসনে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেবেন জামায়াত নেতারা।

আর যদি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জন করে, তবে জোটের ছায়াসঙ্গী হিসেবে নির্বাচন ঠেকানোর ব্যাপক প্রস্তুতি আছে জামায়াত-শিবিরের। সেই প্রস্তুতির কিছুটা আলামত মিলেছে গত ৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের নগর শিবির কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানে।

নগর পুলিশের উপ-কমিশনার মেহেদী হাসান বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার সামনে রেখে শনিবার সন্ধ্যায় নগরের দেওয়ান বাজার, চকবাজার ও চন্দরপুরা এলাকায় অভিযান শুরু করে পুলিশ। এরই অংশ হিসেবে পুলিশের একটি দল চন্দরপুরার ডিসি রোডে শিবিরের কার্যালয়ের কাছাকাছি পৌঁছলে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়। চারতলা ভবনের ছাদে ও ভেতরে চারটি বিস্ফোরণ ঘটায় শিবিরের নেতাকর্মীরা। পরে চারতলা ভবনটির তৃতীয় তলা থেকে ছয়টি ককটেল এবং ককটেল তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিস্ফোরণের পরপরই চকবাজার, কোতোয়ালি ও সদরঘাট থানার কয়েকশ’ পুলিশ চারতলা ভবনটি ঘিরে ফেলে। আমাদের ধারণা ভবনটিতে বোমা তৈরি করা হচ্ছিল। পরে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটকে সঙ্গে নিয়ে রাত ৯টার দিকে আবারও ওই ভবনে প্রবেশ করে পুলিশ দেখতে পায়, ভবনটির পেছনে দুটি দরজা আছে। ধারণা করছি, ওই দরজা দিয়ে শিবির নেতাকর্মীরা পালিয়েছে।’

‘আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে শিবির গোপনে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে আমরা আশঙ্কা করছি’- যোগ করেন তিনি।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম সিটিজি ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ছয় মাসে চট্টগ্রামে জামায়াতের বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাসহ ছাত্রশিবিরের কয়েকশ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াত-শিবিরের নাশকতার বিস্তারিত পরিকল্পনার বিষয়ে আমরা জেনেছি। ২০১৩-১৪ সালেও তারা চট্টগ্রাম নগরে ও মহাসড়কে ব্যাপক সহিংসতা চালিয়েছিল। তবে, এবার আমরা আগে থেকেই সজাগ। নাশকতার চেষ্টা হলে সর্বাত্মকভাবে প্রতিরোধের সব প্রস্তুতি আমরা নিচ্ছি।’

সূত্র জানায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম ছাত্রশিবিরের ১৩ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ সংগঠনটির ১০ পৃষ্ঠার একটি নথি উদ্ধার করে। যেখানে, ২০১৮ সাল অর্থাৎ নির্বাচনের বছরে ইসলামী ছাত্রশিবিরের স্ট্র্যাটেজিক (কৌশলগত) প্ল্যানের পুরোটাই রয়েছে।

পুলিশের হাতে থাকা শিবিরের সেই কৌশলগত প্ল্যানের বিষয়ে জাগো নিউজও অভিহিত হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে ছাত্রশিবির নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড ও স্কুল-কলেজ মিলিয়ে ১৮৪টি ইউনিটে কোরআন ক্লাস ও আলোচনা চক্র পরিচালনা করেছে। ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম নগরের ১৬টি থানা এলাকাকে ৫২টি সাংগঠনিক থানায় ভাগ করে কাজ শুরু করে ছাত্রশিবির। নির্বাচন সামনে রেখে এই ৫২টি সাংগঠনিক থানায় মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকবেন ২৫৮ জন দায়িত্বশীল নেতা। তাদের অধীনে মাঠে থাকবেন ২০ হাজার প্রশিক্ষিত কর্মী। প্রতিটি ইউনিট থেকে আটজন করে প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়ে গঠন করা হয়েছে সমন্বয় কমিটি।

চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন সিটিজি ট্রিবিউনকেবলেন, ‘ইসলামী ছাত্রশিবিরের কার্যালয়ে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় নগর উত্তরের সভাপতি আব্দুল জব্বার ও সাধারণ সম্পাদক আ স ম রায়হানসহ ৫২ জনের নাম উল্লেখ করে মোট ৯০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন সময় গ্রেফতার শিবিরের নেতাকর্মীরা জিজ্ঞেসাবাদে জানিয়েছিলেন, জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা আগামী নির্বাচন সামনের রেখে সংগঠিত হচ্ছে। এ লক্ষ্যে তারা জনশক্তি বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নাশকতার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় চার বছর নিশ্চুপ থাকার পর গত কয়েক মাস ধরে নতুন কৌশলে নগরের বিভিন্ন এলাকায় সংগঠিত হতে শুরু করেছে ছাত্রশিবির। কৌশলের অংশ হিসেবে শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে না এসে সংগঠনের সাথী ও সমর্থকদের দিয়ে ঘর গোছানোর কাজ করছে। তারা প্রকাশ্যে মিছিল-মিটিং না করলেও ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মাদরাসা, মসজিদে গোপন বৈঠক করে কর্মী সমর্থকদের উজ্জীবিত করছেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঐক্যফ্রন্ট বা ২০ দলের বাইরে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রভিত্তিক আলাদা কমিটি থাকবে।

 

ctg-shibir-2

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয় ছাত্রশিবির। সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ২০১৫ সাল থেকে ঘরোয়া রাজনীতির মাধ্যমে সংগঠনকে শক্তিশালী করার দিকে নজর দেয় তারা। এরপর থেকে রাজপথে সক্রিয় না থাকলেও সংগঠনকে শক্তিশালী করতে থাকে ক্যাডারভিত্তিক দলটি। কয়েক বছর আলোচনার বাইরে থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ধরপাকড় এড়াতেও সক্ষম হন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।

এই সুযোগে গত চার বছরে চট্টগ্রাম নগরে অন্তত ২০ হাজার প্রশিক্ষিত কর্মী বা ক্যাডার তৈরি করেছে ছাত্রশিবির। এর মধ্যে রয়েছেন ধর্মভিত্তিক সংগঠনটির অমুসলিম কর্মী-সমর্থকও।

উদ্ধার হওয়া শিবিরের গোপন নথি থেকে জানা গেছে, শুধু চট্টগ্রাম কলেজে তাদের অমুসলিম কর্মীর সংখ্যা ৩৩০ জন, মহসিন কলেজে ৫৩৭ জন। চট্টগ্রাম নগরে এ সংখ্যা পাঁচ থেকে সাত হাজার। আর ২০১৮ সালের নির্বাচনের বছরে শুধু চট্টগ্রাম নগরে মোট ১৩ হাজার প্রশিক্ষিত কর্মী (মুসলিম-অমুসলিম) তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করে ছাত্রশিবির।

শিবিরের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন রিপোর্ট অনুযায়ী, তাদের সবচেয়ে মজবুত সংগঠন রয়েছে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। এরপরই আছে সরকারি স্কুল ও কলেজ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সর্বশেষ নির্বাচন ঘিরে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত দেশের সব শাখায় দিক-নির্দেশনামূলক একটি বক্তব্য পাঠিয়েছেন। যেখানে ২০টি দফার কথা উল্লেখ আছে। নির্বাচন নিয়ে ছাত্রশিবিরের পরিকল্পনায় সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নিজেদের বড় শক্তি হিসেবে প্রকাশের কথাও সেখানে উল্লেখ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার সিটিজি ট্রিবিউনকেবলেন, ‘কিছুদিন পরপর ছোবল দেয়া জামায়াত-শিবিরের একটি কৌশল। স্বাধীনতার পরও তারা বেশ কিছুদিনের জন্য আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। সুবিধাজনক সময়ে ঠিকই তারা দেশের রাজনীতিতে অবস্থান করে নেয়।’

‘এবারও যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হওয়ার পর কিছুদিনের জন্য নিখোঁজ হয়ে যায় দলটি। কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা সক্রিয় হচ্ছে। জামায়াত দেখছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারা এখন একঘরে। তাই যেকোনো উপায়ে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করে সরকারবিরোধী শিবিরে নিজেদের ধরে রাখার চেষ্টা করছে নিবন্ধন হারানো দলটি।’

 

Please follow and like us:
comments

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *